যুদ্ধক্ষেত্র

পূর্বে প্রকাশিত

আমার নাম আহমেদ সালেহিন।
বয়স ২৪ বছর। হাভারড ইউনিভার্সিটি থেকে সিএসইতে পিএইচডি করেছি।

এখন দেশে ফিরে সবচেয়ে বড় আইটি ফার্ম ইনফিনিটি ইনকর্পোরেটেডে যোগ দিয়েছি প্রোগ্রামিং সেক্টরের সিইও হিসাবে। এমনিতে ইউনিভার্সিটিতে ক্লাস নিই।

একদিন ভার্সিটিয়ের ক্লাস শেষ, নিজের চেম্বারে আছি। চিন্তা করছি যে মানুষের পৃথিবী ধ্বংসের কথা ছিল তা আজ সবুজে সজীব।

মানুষ কি তবে তার ভুল শুধরে নিতে শিখলো?





এরকম ভাবনাটা ভেঙ্গে গেল মেইলের আওয়াজে। ইনফিনিটির এইচকিউতে যাওয়া লাগবে। ধিরে সুস্থে নিচে নামতে লাগলাম।

আমার চেম্বার ১৬ তলায়। এমনিতে লিফটে নামি। তবে আজ যেন সময় কাটাতেই সিঁড়ি দিয়ে নামলাম।

গেটের সামনের পারকিং লট থেকে বাইক আনলক করে তাতে করে আপেক্ষিকের এইচকিউ তে রওয়ানা হলাম।





আমার ভার্সিটি তেজগাঁওয়ে, উত্তরার এইচকিউতে যেতে সময় লাগলো ৫০ মিনিট। আসার সময় মনে হল বাইক ছুটিয়েছি ঘণ্টায় ১২০ মাইলে!

তবুও এতো দেরিতে?

যাই হোক, ভেবে লাভ নেই, বাইক আন্ডারগ্রাউন্ড গ্যারেজে পার্ক করে লিফটে ৫ তলায় উঠলাম ।



আমাদের এইচকিউ ৭ তলা। উত্তরায় জায়গা কিনে তাতে ভবন উঠাতে হয়েছে। আগে মিরপুরে ৩ তলা ভবন ভাড়া করে কাজ করতাম আমরা।

কিন্তু স্লিপ সিমিউলেসশন সফটওয়্যারের পেটেন্ট বিক্রয় করেছি আমরা ৩৫ মিলিওন ডলারে! তার ৬৫ শতাংশ ইনফিনিটির কাজে আর বাকি টাকা প্রোজেক্টের সকলের কাছে মূল্য হিসাবে দিয়েছি। সেই টাকা দিয়ে এখানে ভবন তলা হয়েছে। এমনকি এখানে একটা শক্তিশালী সুপার কম্পিউটারও আছে,

সম্পূর্ণই দেশে তৈরি করা। তার একটা কপি আমরা সামরিক প্রতিরক্ষা দপ্তরে বিক্রি করেছি।

এখানে প্রায় সারা পৃথিবী থেকে ৪ লাখ মানুষ অনলাইনে কাজ করে। বেশ বড় পরিসরে!

৫ তলায় আমার রুম আছে, সেখানে কাজ করি। প্রয়োজন রাতে থাকি। আবা রেতাই আমার এখানে চেম্বার।

গিয়ে বসলাম। এখন আমার দায়িত্ব পড়েছে রিয়েল টাইম হিউম্যান সিমিউলেসশন নামের একটা কম্পিউটার অপারেটিং সিস্টেমের প্রোগ্রামারদের কাজ

পরিচালনা করা। কাজটা আমার ভালই লাগে।

কিন্তু আজ বিরক্ত লাগছিল। প্রোজেক্টের প্রায় ৮৯ শতাংশ শেষ বলে আজকের রিপোর্ট আসেছে। এখন ডেমো রান করা হচ্ছে।

কিভাবে ইনপুট আউটপুট দেবে সেটা ঠিক করা হয়নি।



সেটা আমারও চিন্তা হচ্ছে! কমল ফাইজলামি করে বলেছিল যে, ”মাথা ফুটো করে সেন্সর বসাবো!”

গা সিরসির করেছিলো তখন। তবে বিশ্বাস করি নাই।
তবু গেলাম ওর সাথে।



হঠাৎ কমল ডেকে বলল, "এদিকে আয়, কাজ আছে..."
"কি কাজ?"
"সেরেব্রাল মাইক্রচিপ টেস্ট করব"
"এটা কি? ভয়ঙ্কর কিছু? কিভাবে করবি?"
"তেমন কিছু না, হেলমেটের মতো। তুই পরে দেখবি।"
"তেমন কিছু হইব নাতো?!"
"না, তুই চল"

আমাকে নিয়ে সোজা চলল স্টুডিওর দিকে।

স্টুডিওটা বেশ বড়। সবুজ দেয়াল। মূলত অ্যানিমেশন আর ভিডিও ডেভেলপমেন্টের জন্য এই রুম ইউজ হয়। আজ এখানে এটা কেন টেস্ট করবে সেটা বুঝে উঠলাম না।

তাওসিফ বলল, "ভয় পাস না। রিয়েল তাইম হিউম্যান সিমিউলেশনের সাথে এটাকে কানেক্ট করা হয়েছে।"
"ভয় পাচ্ছি না"
"৫ মিনিট, সমস্যা হলে বন্ধ করে দেবো।"
"কি বন্ধ করে দিবি? "
"পুরা অপারেটিং সিস্টেম"
"হু..."
"কি হু? সিরিয়াসলি তুমি ভাই এটার ভেতর যাচ্ছ! "
"হ্যাঁ!?!?"
"হ্যাঁ।"

 কাচের দেয়ালের ওপাশে জনির গ্রাফিক্সের টিম বসে আছে একগাদা যন্ত্রপাতির সামনে। বুঝলাম না এখানে কাজ কি।
মনে হয় কোনও রকম গ্রাফিক্স এখানে এন্ট্রি করা হয়েছে।
ওদের টিম "লিবারেট বাংলাদেশ" নামের গেইম তৈরি করেছে।

আমাকে একজন টেকনিশিয়ান চোখে বিশেষ ডিসপ্লে গগলস, কানে হেডসেট, আর হেলমেটের মতো সেরেব্রাল সেন্সরের ক্যাপ পরিয়ে দেয়া হল। আমাকে ধরে একটা চেয়ারে বসাল একজন। পুর সিস্টেম ওয়্যারলেস। হঠাৎ আমারও একটু ভয় করতে লাগলো।

ঠিক ৫ মিনিট পর সিস্টেম এনগেজ করা হল। এবং আমার মনে হল, যেন আমি একটা কালো গর্তে পরে গেলাম।


যখন জ্ঞান ফিরল, তখন নিজেকে আবছা অন্ধকার জায়গায় আবিস্কার করলাম। পড়ে গেলেও বোধ হয় ব্যাথা পাইনি।
নরম কিছুর ওপর পড়েছি। গায়ে কোনও ম্যাজম্যাজে ভাব নেই, ব্যাথাও নেই। একদিকে আলোর
পরিমান বেশি। সেদিকে বেরোবার রাস্তা থাকতে পারে।

দেখে মনে হচ্ছে খনিজ গুহা। উপরে স্টেলাগটাইটের ঝুড়ি। মানে সূচালো সাদা ঝুল। পুরো গুহা সাদা পাথরে পূর্ণ। হেঁটে হেঁটে গুহা মুখে পৌছালাম।
কিন্তু একটা বিশাল পাথর মুখ নব্বই শতাংশ আটকে রেখেছে। ফাঁক দিয়ে আলো আসছে। কিন্তু বের হবার মতো যায়গা নেই। শুধু শুধুী ঠেলতে গেলাম। আমাকে অবাক করে দিয়ে পাথর সরে গেল। নিজের এলেমে নিজেকেই সাবাস দিতেমন চাইলো!

বাহিরে পাথর আর পাথর। পাথুরে সমুদ্রতট। একটা শো শো আওয়াজ কানে লাগছিলো। প্রচুর বাতাস। একটু সামনে পাথর শেষ, বালি শুরু। পাশে উঁচু খাড়াই পাহাড়। আমার পিছনের ৩ দিকে পাহাড়। একপাশে সমুদ্র। আকাশ অস্বাভাবিক নীল। সূর্যটা পূবে। বুঝলাম কারন আকাশ তেমন একটা লাল নয়। আর ভাটা চলছে। জোয়ার-ভাটা আমি চিনি। সমুদ্রে বহুবার এসেছিলাম।
সাঁতারো ভালো জানি, পানিতে নেমে পড়লাম।
পানি ক্রিস্টালের মতো স্বচ্ছ, তবে নোনা। সাঁতরে কিছুদূর গিয়ে পিছে ফিরে তাকালাম। ১০০ গজ মতো এসেছি। মনে হচ্ছে একটা দীপপুঞ্জে আছি। তবে সন্দেহ রয়ে যাচ্ছে এটা মুল-ভুখন্ড না দীপ।

২৫ মিনিটের মাথায় তীরে ফিরলাম, হাতে ঘড়ি ছিল। পুরোপুরি জনমানব শূন্য উপকূল।
পাহাড় বেয়ে উঠে দেখব কিনা ভাবলাম...

তিনটা পাহাড়ের একটা কম খাড়াই। সেটা বেয়ে উঠবো বলে ঠিক করলাম।
অতি কষ্টে পাহাড় বেয়ে উঠতে লাগলাম। ৫০ মিটার মতো উঠতে লাগলো প্রায় ১ ঘণ্টাপর মাথায় উঠে এলাম।

আসলেই এটা একটা দ্বীপ। এখান থেকে সব পরিস্কার দেখা যাচ্ছে। দ্বীপের মাঝে একটা সবুজ ঘাসের মাঠ, চারিদিকে জঙ্গল। দুরেই একটা... হ্যাঁ, বাড়ির কাঠামো। এখানে বাড়ি?!

পাঁচ ছয় না ভেবেই মনে হল এখানে মানুষ থাকে। সোজা হাটতে লাগলাম বাড়িটার দিকে। দ্বীপ, তাই জন্তু জানোয়ার না থাকারই কথা। তবে প্রচুর পাখি আছে।

পাহারের উল্টোপাশ বেয়ে নামতে লাগলাম। পৌঁছলাম জঙ্গলের কোনায়। নেমেই মাথায় এল, দিক চিনতে যদি ভুল করি?

তখন পপ্রাচীন কিন্তু উপযোগী উপায়ে কম্পাস বানালাম। পাতার ওপর ঘড়ির ধাতব পিন চুলে ঘষে রাখলাম। সেটা কাছের একটা ডোবাতে রাখতেই উত্তর দক্ষিণ পেয়ে গেলাম। বাড়ি গোছের জিনিসটা দক্ষিনে। কম্পাসটা পকেটে ভরে হাঁটতে লাগলাম দক্ষিনে। বাড়িটায় যেতে ৩০ মিনিট মতো লাগলো। পাঁচশো মিটার মতো।

ভেতরে মানুষ থাকে বলেই মনে হল। ভেতরে বেশ কয়টি মিলিটারি এয়ারক্র্যাফটের সিট আর হ্যামক।
অনেকে থাকতো।
মনে হয় সেনাবাহিনির বিমান এখানে ক্রাশ করেছিলো।

একটা জেনারেটর পেলাম, ঘরের কোনে তেরপল দিয়ে ঢাকা। নয় টিন পেট্রোল। ছোট একটা ব্রিফকেইস কম্পিউটার। একটা বাক্সের ওপর ২ ফিটের মতো রাডারের মতো যন্ত্র। বিশটার মতো খাবারের টিন। বোতলে পানি।
নিচে একটা লাঠির মতো... এম৪ রাইফেল!
ম্যাগাজিন প্রায় খালি। একটা বাক্সে খুঁজে পেতে দু'টা ভর্তি ম্যাগাজিন পেলাম। সাথে একটা টর্চ।

কোমরের বেল্টে টর্চ গুঁজে রাইফেল হাতে বের হলাম। রাইফেল চালাতে পারি না। তবু হাতে রাখলে যেন অন্যরকম সাহস এসে পড়ে।
এই বাড়িটা পাথুরে কুঁড়ে ঘরের মতো। দ্বীপটার তীরের দেড়শ মিটার মতো ভেতরে। কাঠ, পাথর আর পাতার তৈরি।
সমুদ্রের দিকে যেতে একটা জেটির মতো যায়গা চোখে পড়ে।
সেই জেটির কাছে বেশ কিছু পায়ের ছাপ পেলাম, টাটকা। মনে হল, এখানে নৌকা আসা-যাওয়া করে। নউকার তলানির ছেঁচড়ানোর দাগ আছে।

আমি সব দেখে একটা টিলার ওপর চড়ে বসলাম। অপেক্ষা। এখানকার বাসিন্দাদের আসার অপেক্ষা।


প্রায় দুপুর দুটা বাজে বলে আন্দাজ হল। হটাৎ ঘড়ি কাজ করছে না। টিলায় একটা নারিকেল গাছ ছায়া দিচ্ছে। এমফোরের টার্গেট ফাইন্ডারে চোখ রাখলাম, ৫০০ মিটার অবধি রেঞ্জ। একটি তেপাতেপি করতেই বুঝে গেলাম কিভাবে চালায়।
টিলায় সুয়ে সমুদ্রে চোখ রাখছি।

ঝিমুনি লাগছে...

হঠাৎ একটা সিগাল দেকে উঠলো!

ঘুম ভেঙ্গে গেল। সূর্য দিগন্তে অস্ত যায়।

এই! সূর্যের মাঝে ওটা কি?!

একটা নৌকা! বুঝেছি! বাসিন্দা!

ওদের একজনের হাতে কিছু ঝিকমিক করছিল... বায়নোকুলার। এখন হাতে অস্ত্র রাখা শোভন দেখায় না। জে কেউই হোক, আমাকে ভালো মনে করবে না। অস্ত্র মাটিতে রেখে দিলাম। দুশো গজ মতো এলো। হাতে দূরপাল্লার এসভিডি রাইফেল।
গেইম ডেভেলপমেন্ট সেক্টরে কাজ করার সময় প্রচুর অস্ত্রের নাম জানা হয়ে গেছে।

প্রায় ৫০ গজ মতো আসার পর বুঝলাম লোকটা একা নয়।
ছাউনিতে ২জন আছে, একজন শুয়ে আছে। কিছু বাক্স তাদের সাথে। আমি টর্চ জ্বেলে সঙ্কেত দিলাম, এখানে মানুষ আছে।
মনে হল লোকটি আমার দিকে রাইফেল বাগালো! ভয় পেয়ে গেলাম! যদি গুলি করে!
না, গুলি করলো না। আমিও স্থির হয়ে দাড়িয়ে রইলাম। তারা পাঁচ মিনিতের মদ্ধেই তীরে নৌকা ভেরালো। একজঙ্কে ঘারে তুলে নিয়ে কুরে ঘরে ঢুকল।
 বোধহয় অসুস্থ বা আহত, বন্দিও হতে পারে। এরা কারা তবে?

সেই একজন, যার হাতে এসভিডি ছিল, রাইফেলের নল নিচে নামিয়ে আমার কাছে এলো।
ইংরেজিতে জিজ্ঞাশ করলো, তারপর আমায় অবাক করে বাংলায় বলল,
- তুমি কে?
- আমি সালেহিন, পথ হারিয়ে এসেছি।
- কিভাবে হারালে?
এর জবাব কিভাবে দেই?... যেভাবে এসেছি সেটা শুনলে নির্ঘাত পাগল ঠাওরাবে।
অবলিলায় বললাম, 'নৌকা দুবে এখানে এসে পড়েছি।'
'নৌকায় কোথায় যাচ্ছিলে?'
'চট্টগ্রাম'
'বাংলাদেশের চট্টগ্রাম?'
'হ্যাঁ।'
'তুমি এখন কোথায় জানো?!'
'কোথায়?'
'শ্রীলঙ্কার উপকূলে!'
'তোমরা কারা?'
'আমজনতা, বিদ্রোহী, যা খুশি তা বলতে পারো।'
আমি বললাম, 'তোমার নাম কি?'
'পিটার। আমার নাম পিটার কারুনারাত্ন। আমি শ্রীলঙ্কান। তুমি কি বাংলাদেশী? মনে তো হচ্ছে তাই...'
'হ্যাঁ, আমি বাংলাদেশী। তুমি বাংলা জানো কিভাবে?'
'শিখেছি, তোমাদের দেশে আমি ছিলাম।'

ইতস্তত করে বলেই ফেললাম,
'তোমরা রণাঙ্গনে কেনো?'
'মানে? ঠিক বুঝলাম না।'
'তোমরা যুদ্ধক্ষেত্রে কেনো?'
'বাংলা আমার ভালো শেখা হয় নি, আচ্ছা, কেনো যুদ্ধ করছি জানতে চাও?'
'হ্যাঁ!'
'বঙ্গোপসাগরে ইউরেনিয়াম পাওয়ার খবর জানোনা? দক্ষিন এশিয় দেশগুলো চাচ্ছিল সেটা একত্রে সংগ্রহ করতে। মাঝে কেউ বা কারা বাগড়া দিলো। দক্ষিন এশিয় দেশগুলোর মধ্যে যুদ্ধ লাগিয়ে দিলো।'
পিটার বলতে লাগলো,
' বর্তমানে মাফিয়ারা সেখানে পেট্রোল শিপ দিয়ে ঘিরে ইউরেনিয়াম চুরি করছে। এই ইউরেনিয়াম তারা তৃতীয় বিশ্ব থেকে চুরি করে পশ্চিমে পাঠাচ্ছে'
'বল কি??'
'কিন্তু মাফিয়া লিডার যে সে আত্মগোপন করে নেই! একটা বিলাসতরী নিয়ে ভূমধ্যসাগরে অবস্থানে আছে সে'
হটাৎ সে অন্যরকম দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকাল, অনেকটা বুনো দৃষ্টি!
'তুমি কি তাদের গুপ্তচর নাকি?'
'কাদের? কি বলতে চাও? '
'মাফিয়াদের!'
'না, আমার সাথে তোমার সাক্ষাৎ হল দশ মিনিট না, তুমি সন্দেহ করছ?'
'আমি নিজেকে বাদে সবাইকে সন্দেহ করি'
'আচ্ছা, তবে আমাকে বিশ্বাস করতে পারো।'
'দেখা যাবে, আপাতত তোমাকে বিশ্বাস করলাম, বিশ্বাস ছাড়া টিকে থাকা যায় না এখানে'

আমি আর কিছু বললাম না, সন্ধ্যা হয়ে এলো। ওদের একজন আমাকে ডেকে নিয়ে গেলো কুঁড়ের কাছে। কথাবার্তায় জানলাম ওর নাম সঞ্জয়, থাকে ভারতের মধ্যপ্রদেশে। কিভাবে সে যুদ্ধে এসেছে জানতে চাইলে সে তার পরিবার হারানোর কথা বলল, তখন তার চোখ ছল ছল করছিল। হঠাৎ থেমে চোখ মুছে আবার আমার সাথে চলল। তখন বলল, 'আমি আর্মিতে লেফটেন্যান্ট ছিলাম, কোয়ার্টারে বলা নেই কওয়া নেই, একের পর এক মর্টার পরতে লাগলো। বাড়ির ওপরে আর্টিলারি এসে পড়ল, চোখ খোলার আগেই সব শেষ! বিতৃষ্ণায় ব্যাক্তগত কেস থেকে রাইফেল বের করে মাফিয়াদের শুট করতে লাগলাম, কিন্তু ওরা আমাকে ধরে ফেললো। পিটার তার দলবল নিয়ে ওদের ঘাঁটিতে হামলা করে, তখন থেকেই আমি এখানে ওদের সাথে আছি এই যুদ্ধে।'
আমি আর কোনও কথা না বলে আগুনের পাশে শুয়ে পড়লাম। বেশিক্ষন লাগলো না, ঘুমিয়ে গেলাম কখন বুঝতেও পারলাম না।

সকালে আমরা খাবার শেষ করলাম ভেড়ার মাংস আর শুকনো রুটি থেকে, পিটারের রসদে জমা ছিল এগুলো।
কথা বার্তা বলতে বলতে প্রায় দুপুর গড়িয়ে আসছে। তখনি আমরা একটা গানশিপের আওয়াজ পেলাম। সকলে তারাহুরো করে বাহিরে বেরিয়ে এলাম।

একটা নয়, দুটা নয়, পাঁচটা হাভক গানশিপ ছুটে আসছে। আমাদের খোঁজ পেয়েই মনে হয়।

হ্যাভক গানশিপ
পিটার তার দলকে চোখের ইশারা দিলো, সকলে যার যার রাইফেল তুলে নিলো। কিন্তু সে আর সঞ্জয় হাতে নিলো ছাঁদে বসানো সাইড উইন্ডার ২ অ্যান্টি এয়ারক্রাফট মিসাইলের কন্ট্রোল।

আর?

২ মিনিটেই ৩টা গানশিপ হেলিকপ্টার পরে গেলো পানিতে আর আমরা গুলি করে আরেকটা ফেলে দিলাম। অন্য একটা গুলি খেয়ে সমুদ্র তীরের গাছে বারি খেয়ে বিস্ফোরিত হল।

কিন্তু আক্রমন শেষ হল না, আমরা রিলোড করার সময় পেলাম কেবল। ধ্রুত সাইড উইন্ডারের আমো পূর্ণ করে দিলাম। মিসাইল মজুদ করা ছিল কুঁড়ের নিচের গুদামে। গুদাম দেখে আমিও বিশ্বাস করতে চাইনি, ভেতরে অত্তাধুনিক একটা রেডিও রুম। যেকোনো সিগ্নাল এখান থেকে জাম করে দেওয়া যায় এবং স্যাবট্যাজ করা যায়।

সাইড উইন্ডার এন্টি এয়ারক্রাফট মিসাইল

আক্রমন শুরু হল আবার ২০ মিনিট পর, এবার গান বোট থেকে। গুদাম থেকে আমরা মেশিন গান মাউন্ট করা ট্রলি বের করে আনলাম।
দ্রুত ৩ টা মেশিন গান তিনটা টিলার ফাঁকে সেট করা হল। তিনজন সেখানে পজিশন নিলাম।

পিটার আর সঞ্জিব একটা ছোট স্পীড বোট করে সেই দুইটা গান বোটের দিকে ধাওয়া দিলো, প্রথমে গান বোট গুলো পাত্তা না দিয়ে গুলি চালাতে লাগলো, ভাগ্যবশত কারও ক্ষতি হল না। কিন্তু তারা ভয় পেয়ে গেলো স্পীড বোটে বসানো গাইডেড মিসাইল দেখে, পিটার মিসাইল খরচ না করে কৌশলে গুলি চালালো।
কিন্তু রাইফেলে কতক্ষণ?

তীর থেকে গর্জে উঠলো তিনটা মেশিনগান, একটা গান বোটে আগুন ধরে গেলো, অপরটাতে আমরা সকলে আরেকটা বোট নিয়ে ধাওয়া করলাম।

কিছুক্ষনের মধ্যে আমরা অন্য গান বোটে উঠে পড়লাম, বন্দুক যুদ্ধে শত্রু সেনারা বেঁচে রইল না।

গান বোট এলো আমাদের দখলে...


তীরে ফিরে এলাম আমরা।

আমি বোটের নিচের একটা কক্ষ থেকে ষোল জন বিদ্রোহীকে বের করে আনলাম।

আমরা গান বোটে খুজতে লাগলাম প্রয়োজনীয় রশদ।

আমার মন রশদ সংগ্রহে ছিল না।
বোটের কম্পিউটার চালু করলাম।
ছাত্র জীবনে হ্যাকিং শিখেছিলাম, সে কথা কাউকে জানানোর প্রয়োজন মনে করিনি।

কিন্তু ড্রোন কন্ট্রোল সারভারে এতো বড় বাগ????

বিশ্বাস করতে পারলাম না নিজের চোখকে!
ধ্রুত কিছু নিরাপত্তা কোড হ্যাক করে নিলাম। এবং পিটারকে ডেকে আনলাম।

সেও কিছু বিশ্বাস করতে পারছিল না।

সেদিন রাতেই আমি মাদার শিপের সন্ধান পেলাম, অবার করা বিষয়, আমাদের থেকে মাত্র ২৭ কিলোমিটার দূরে ফগ জোনে, তাই দেখতে পারছিলাম না, এমনকি এরা রাডার শিল্ড ব্যাবহার করেছে!
ওদের স্যাটেলাইটের দখল নিয়ে নিলাম। কিন্তু এক্সেস কোড বদলালাম না, এতে ওরা বুঝে গিয়ে সার্ভার ডাউন করে দিতে পারে।
তখন এসবের কোনও মূল্য থাকবে না।

সেদিন ভোরে আমরা পরিকল্পনা করলাম, মাফিয়া নেতাকে সরাসরি হামলা করে হত্যা করা হবে।
আমি ড্রোন গুলো থেকে সতেরটা উরিয়ে দিলাম আর্মড পজিশনে। থেমে থেমে মাদার শিপের ওপর গোলা ফেলতে লাগলো সেগুলো। কিছু রবোকপটার থেকে মেশিন গান নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করলাম।
দ্রুত আমাদের ২৭ জনের দল ভয়ঙ্কর ভাবে সজ্জিত অবস্থায় আক্রমন করলো মাদার শিপ।

শুট টু কিল পজিশন,  দেখা মাত্র গুলি চালাচ্ছি, অবশ্যই সিভিলিয়ান বাদ দিয়ে।

আমরা ডিজিম্যাপ (ডিজিটাল + ম্যাপ) দেখে এগোচ্ছি, প্রায় চলে এলাম মাফিয়া বসের রুমের কাছে, সেখানে একটা ক্যানন প্রটেক্টিভ ষ্টীল দর লাগানো, হাল ছাড়লো না পিটার।
চুয়াত্তর হাজার মেগা ওয়াট লেজার বীম দিয়ে কেটে ফেললো দরজা!

কিন্তু সেটাই কাল!

প্রচণ্ড বিস্ফোরণ!

আমরা এদিক সেদিক ছিটকে পড়লাম।

আমি আর আট জন গুলো চালাতে লাগলাম।

বিশ্বাস হবে না নিজ চখে না দেখালে, তবে তখন করলাম, কারন নিজ চোখে দেখেছি!!

বস সম্পূর্ণ দেহে প্রটেক্টর স্যুট লাগিয়েছে, সেখানে ঘারের কাছে ছোট্ট একটা মিসাইল সেট!
হাতে একটা মিনিগান!

আর দেরি করলাম না, ব্যাক প্যাক থেকে সিফোর চারজার বের করে ছুড়ে দিলাম,
আর প্রচণ্ড আওয়াজ,
আর আমি অন্ধকারে,
সব নিকশ কালো!

ধরফর করে জেগে উঠলাম!
আমার মাথায় এখনো আই/ও প্রোব লাগানো! অবাক হচ্ছি! প্রথমে বুঝিনি আমি কোথায়, তারপর বুঝলাম আমি ল্যাবরেটরিতে এক্সপেরিমেন্ট জোনে।

আমাকে দ্রুত পেইন কিলার দেওয়া হল। সকলে অবাক হয়ে আছে।

কারনটা হল, ঘড়িতে তখন মাত্র পাঁচ মিনিট হয়েছে! 

শেয়ার করুন

লেখকঃ

আমি তাওসিফ তুরাবি, অনলাইনাম (অনলাইন + নাম) ব্লগার তাওসিফ। এখন, ২০১৬ পর্যন্ত আমি ১৬ বছরের এক কিশোর। পড়াশোনা করি শহীদ পুলিশ স্মৃতি কলেজে। টেক ব্লগ লিখতে ভালবাসি। সাইন্স ফিকশন আর গল্প লিখতে পছন্দ করি।  জিআর+ ব্লগের এর একজন প্রতিষ্ঠাতা অ্যাডমিন।
আমাদের একটা ওয়েব ডেভেলপার ফার্ম আছে যার নাম জিআর+ আইটি বাংলাদেশ
এছাড়া আমার ব্যাক্তিগত ব্লগ রয়েছে। আমার ফেসবুক আইডিতে আমার সাথে সর্বক্ষণ যোগাযোগ করতে পারবেন। 


পূর্ববর্তী পোষ্ট
পরবর্তী পোষ্ট